ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬,

নিস্তব্ধ ফিরোজা, নিঃশব্দ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

| আহমেদ ইফতেখার

জানুয়ারি ২, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

নিস্তব্ধ ফিরোজা, নিঃশব্দ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি

রাজধানীর গুলশানের ‘ফিরোজা’ আজ শুধু একটি বাড়ি নয়—এটি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। এই বাড়ির দেয়াল, বারান্দা, বাগান আর প্রহরীদের ছাউনির ভেতর জমে আছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের বহু উত্থান-পতনের স্মৃতি। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে দাঁড়ালে যে নিস্তব্ধতা চোখে পড়ে, তা আর দশটি শোকের দৃশ্যের মতো নয়; এটি যেন একটি যুগের সমাপ্তির নিঃশব্দ ঘোষণা। বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান সেই শূন্যতাকেই আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনই ছিল খালেদা জিয়ার আশ্রয়। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির বাসস্থান হারানোর কাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দম্ভ ও প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। এক-এগারোর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সেই অধ্যায় শেষ হলে ‘ফিরোজা’ হয়ে ওঠে তার একমাত্র ঠিকানা—একটি ব্যক্তিগত বাসভবন, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব লাভ করে।

ফিরোজা শুধু আবাসন নয়, এটি প্রতিরোধ ও সহিষ্ণুতারও প্রতিচ্ছবি। ২০১৮ সালে এই বাড়ি থেকেই আদালতে গিয়ে খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়া ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত মুহূর্ত। দুর্নীতি মামলার রায়, সরাসরি কারাবরণ—সব মিলিয়ে তা ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যক্তিগত জীবনের বলি হওয়ার এক নির্মম দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে করোনা মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়ে তিনি যখন আবার ফিরোজায় ফেরেন, তখন এই বাড়ি যেন হয়ে ওঠে বন্দিত্ব ও মুক্তির মাঝামাঝি এক প্রতীক্ষালয়।

আজ সেই প্রতীক্ষারও অবসান। ফিরোজার ফটকে প্রহরীদের কালো ব্যাজ, নিরাপত্তাকর্মীদের অশ্রুসজল চোখ আর ভারী নিঃশ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নেত্রী রাজনীতির মঞ্চে যত বড়ই হোন না কেন, ঘরের ভেতর তিনি ছিলেন এক মানবিক মানুষ। “খেয়েছি কি না জানতে চাইতেন”—এই ছোট বাক্যেই ধরা পড়ে একজন নেত্রীর আরেক সত্তা, যিনি ক্ষমতার বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের মানুষ হিসেবে দেখতেন। এই মানবিক দিকটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষায় ধরা পড়ে না, কিন্তু ইতিহাসের বয়ানে এর গুরুত্ব কম নয়।

বিএনপির নেতাকর্মীদের বক্তব্যে যে আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তা কেবল দলীয় আনুগত্যের ফল নয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রবিন্দু—একাধারে সংগঠক, প্রতীক ও প্রেরণা। জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শুরু করে ফিরোজা পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর শোক তাই গভীর ব্যক্তিগত শোকের মতোই। তাদের কাছে এই বাড়ির প্রতিটি কোণ স্মৃতির একেকটি আলাদা অধ্যায়।

গুলশানের পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটির দলিল হস্তান্তরের ঘটনাটিও এই সময়টায় নতুন অর্থ বহন করে। এই বাড়িতে এখন অবস্থান করছেন তারেক রহমান—একদিকে পুত্র, অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী। মায়ের মৃত্যুর পর তার দিনভর ইবাদত, দোয়া ও স্মৃতিচারণ শুধু ব্যক্তিগত শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভার বহনের এক নীরব প্রস্তুতির প্রতীকও হতে পারে। মা–বাবা—দুজনই দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন; এখন সেই ইতিহাসের ভার ক্রমেই এসে পড়ছে তারেক রহমানের কাঁধে।

গুলশান কূটনৈতিক এলাকা হওয়ায় জনসমাগম সীমিত, তবু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতি একটি ভিন্ন বার্তা দেয়। হাসানুজ্জামান খানের কথায় “এটা শুধু তারেক রহমানের শোক নয়, গণতন্ত্রপ্রিয় বাংলাদেশীদের শোক”—এই মন্তব্যে ফুটে ওঠে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের বিস্তৃতি। তিনি শুধু একটি দলের চেয়ারপার্সন ছিলেন না; তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের এক পক্ষের প্রধান মুখ। তাকে ভালোবাসুক বা বিরোধিতা করুক—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে শোক বই খোলা, কালো পতাকা উত্তোলন, অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা—এসব আনুষ্ঠানিকতা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির ভাষা। বিদেশি কূটনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিনিধিদের শোক জানানো প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার প্রভাব শুধু দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক পরিচিত নাম, যার উত্থান-পতনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও জড়িয়ে ছিল।

সবশেষে তার দাফন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রা—এ যেন ইতিহাসের এক পূর্ণচক্র। স্বামী–স্ত্রী দুজনই বাংলাদেশের রাজনীতির দুই ভিন্ন কিন্তু পরস্পরসম্পর্কিত অধ্যায়ের নায়ক। একজন সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার প্রতীক, অন্যজন সেই যাত্রার ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী রাজনীতির মুখ।

ফিরোজার আজকের নিস্তব্ধতা তাই কেবল এক ব্যক্তির অনুপস্থিতি নয়; এটি প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও। এই শূন্যতা কে এবং কীভাবে পূরণ করবে—তা সময়ই বলবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখে গেছে। ফিরোজার দেয়ালে জমে থাকা স্মৃতির মতোই, সেই ছাপ মুছে যাওয়ার নয়—বরং আগামী দিনের রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বারবার ফিরে দেখা হবে এই নীরব, শূন্য বাড়িটির দিকে।

Link copied!