ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬,

পুতুল থেকে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

দৈনিক সবুজ নিশান | নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫, ১২:৫৪ পিএম

পুতুল থেকে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

ঢাকা : বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের এক সফল রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটলো এক মহাকালের।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম। তার ডাকনাম ছিল পুতুল। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি টিপসি ও শান্তি নামেও পরিচিত ছিলেন। ‘নন্দিত নেত্রী: খালেদা জিয়া’ শীর্ষক গ্রন্থে তার উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেন, ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ির নয়াবস্তি এলাকায় তার জন্ম। খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার বাড়ি (শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ি) ফেনীর ফুলগাজীতে হলেও তিনি জলপাইগুঁড়িতে বোনের বাসা থেকে পড়ালেখা করেন। পরে সেখানে চা ব্যবসায় জড়ান ইস্কান্দার; বিয়েও করেন। বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের সন্তানদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ‘পুতুল’ই পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতির অন্যতম দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে পরিচিত হন।

১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। পরে স্বামীর কর্মস্থল পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭৭ সালে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বামী জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবেই জীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরই রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। এক বছরের মধ্যেই দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন তিনি।  ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তিনি গণতন্ত্রের জন্য চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬-এর স্বল্পস্থায়ী বিতর্কিত সরকারেও তিনি দায়িত্বপালন করেন, যেখানে অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলনে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ২০০১ সালে তার দল পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং তিনি ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দলের নেতৃত্বে এসে তিনি একাধিক রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দিও হন।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো হারেননি খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের পর বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় কারাবন্দি থাকা; এই সময়গুলোতে তিনি সক্রিয় রাজনীতির বাইরে থাকলেও দলের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখেন।

২০০৬ সালে তার সরকারের নির্ধারিত শাসনকাল শেষ হওয়ার পর, ২০০৭ সালে নির্ধারিত নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে বিলম্বিত হলে, সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই সরকারের সময়কালে, খালেদা জিয়া তার দুই সন্তান-সহ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। ২০১৮ সালে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং ২০১৮ সালে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের এপ্রিল তাকে কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালের মার্চে মানবিক কারণে তাকে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করে মুক্তি দেয় শেখ হাসিনা সরকার এবং রাজনীতিতে কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে, জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে খালেদার দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেন। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর খালেদা দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দি ও পরবর্তী সময়ে শর্তসাপেক্ষ মুক্তির পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। লিভার সিরোসিসসহ একাধিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যান এবং কাতারের আমিরের দেওয়া এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দেশে ফেরেন।

এমটিআই

দৈনিক সবুজ নিশান

Link copied!